বাংলার ইতিহাস জানার বই: ঐতিহাসিকদের গ্রন্থ আর ইতিহাসের উপন্যাস

বাংলার ইতিহাস জানার বই: ঐতিহাসিকদের গ্রন্থ আর ইতিহাসের উপন্যাস

বাংলার ইতিহাস নিয়ে বই বাছতে গেলে দুটো প্রশ্ন সামনে আসে: বইটা কি ঐতিহাসিকের গবেষণা, না ইতিহাসের পটভূমিতে লেখা গল্প? আর কোন সময়টা জানতে চাই? পুরনো তালিকাগুলো এই দুটোকে গুলিয়ে ফেলত, আর অনেক নাম লেখকের সঙ্গে মিলত না। এখানে শুধু সেই বইগুলো আছে, যাদের লেখক আর সাল যাচাই করা গেছে।

বাংলায় বাংলার ইতিহাসের গোড়ার বই

রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় (জন্ম ১৮৮৫, মৃত্যু ১৯৩০) বাঙ্গালার ইতিহাস লেখেন দুই খণ্ডে, ১৯১৪ ও ১৯১৭ সালে। বাংলার বৈজ্ঞানিক ইতিহাস লেখার প্রথম চেষ্টাগুলোর একটি এটি। তিনিই মহেঞ্জোদারো অঞ্চলের প্রাচীনত্বের কথা প্রথম বলেন।

অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় (জন্ম ১৮৬১, মৃত্যু ১৯৩০) লেখেন সিরাজদ্দৌলা (১৮৯৮) আর মীরকাসিম (১৯০৬)। তাঁর গৌড়লেখমালা (১৯১২) পাল সম্রাটদের সংস্কৃত শিলালিপির সংকলন, বাংলা অনুবাদসহ। ১৯১৬ সালে কলকাতায় এক ঐতিহাসিক সভায় তিনি সিরাজদ্দৌলাকে হেয় করতে ব্যবহৃত অন্ধকূপ কাহিনি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এই উদাহরণ থেকে বোঝা যায়, ইতিহাসের বইও সময়ের সঙ্গে নতুন করে যাচাই হয়।

দীনেশচন্দ্র সেনের বঙ্গভাষা ও সাহিত্য (১৮৯৬) বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস। তাঁর বৃহৎ বঙ্গ (১৯৩৫) বৃহত্তর বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস।

নীহাররঞ্জন রায়ের বাঙালীর ইতিহাস: আদি পর্ব প্রথম বের হয় ১৯৪৯ সালে। বইটির জন্য তিনি ১৯৫০ সালে প্রথম রবীন্দ্র পুরস্কারের প্রাপক হন। ১৯৮০ সালে বাড়তি তথ্যসহ এর দুই খণ্ডের সংস্করণ বের হয়।

রমেশচন্দ্র মজুমদার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত বাংলার বহুখণ্ড ইতিহাসের সম্পাদক ছিলেন। সেই কাজ ইংরেজিতে, তবু বাংলার ইতিহাস নিয়ে গবেষণার একটি বড় ভিত। বাংলায় লেখা তাঁর আত্মজীবনী জীবনের স্মৃতিদীপে (১৯৭৮) সেই সময়ের পরিবেশ বোঝার জন্য কাজে লাগে।

রমেশচন্দ্র দত্ত (জন্ম ১৮৪৮, মৃত্যু ১৯০৯) ইতিহাসবিদ এবং ঔপন্যাসিক দুই পরিচয়েই পরিচিত। ইংরেজিতে তিনি লেখেন বাংলার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস (১৮৯৩) আর বাংলা সাহিত্যের আটশো বছরের অগ্রগতি নিয়ে দ্য লিটারেচার অব বেঙ্গল (১৮৯৫)। বাংলায় লেখা তাঁর মাধবীকঙ্কণ (১৮৭৯) ইতিহাসের পটভূমির উপন্যাস।

ইতিহাসের ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া উপন্যাস

ইতিহাসের তথ্য মুখস্থ করার চেয়ে সময়টাকে অনুভব করতে চাইলে উপন্যাস ভালো পথ। ঐতিহাসিক শ্রেণিতে এমন অনেক বই আছে। উপন্যাস ইতিহাসের গবেষণার বিকল্প নয়, তবে একটা সময়ের আবহ, মানুষের কথা বলার ধরন আর দিনযাপনের ছবি সেখানে যেমন মেলে, গবেষণাগ্রন্থে তেমন মেলে না।

  • দুর্গেশনন্দিনী (১৮৬৫): ষোড়শ শতকের শেষে মোগল ও পাঠানদের সংঘর্ষের পটভূমিতে মান্দারণ দুর্গের গল্প।
  • রাজসিংহ (১৮৮২): বঙ্কিমচন্দ্রের একমাত্র ঐতিহাসিক উপন্যাস, ঔরঙ্গজেব আর রাজপুত রাজা রাজসিংহের সংঘাত।
  • আনন্দমঠ (১৮৮২): ১৭৭০ সালের সন্ন্যাসী বিদ্রোহ ও ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের পটভূমি।
  • সেই সময়: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এই উপন্যাসে উনিশ শতকের কলকাতা, নবজাগরণ আর সমাজসংস্কারের সময় ধরা। বিদ্যাসাগর, মধুসূদন, দ্বারকানাথ ঠাকুরের মতো ঐতিহাসিক মানুষ গল্পে আসেন।
  • কালবেলা: সত্তরের দশকের পশ্চিমবঙ্গ আর নকশাল আন্দোলনের পটভূমিতে সমরেশ মজুমদারের উপন্যাস।

মুক্তিযুদ্ধের কথা

জাহানারা ইমামের একাত্তরের দিনগুলি ১৯৮৬ সালে প্রথম ছাপা হয়। দিনলিপির আকারে লেখা এই বইয়ে ১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত যুদ্ধকালীন ঢাকার অবস্থা ধরা আছে। বইয়ের কেন্দ্রে তাঁর ছেলে রুমী, যিনি মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন এবং আর ফেরেননি।

উপন্যাসের পথে এই সময়কে দেখতে চাইলে হুমায়ূন আহমেদের মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসসমগ্র আছে। কিশোরদের জন্য মুহম্মদ জাফর ইকবালের আমার বন্ধু রাশেদ, যেখানে এক মফস্বল শহরের স্কুলছাত্ররা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।

পড়ার আগে জেনে রাখা ভালো

প্রথমে একটি সময় বেছে নিন, যেমন সুলতানি আমল বা ব্রিটিশ শাসন বা ১৯৭১। বইয়ের প্রকাশের সালও দেখে নিন: একশো বছর আগের বইয়ে তখনকার দৃষ্টিভঙ্গি থাকে, পরের গবেষণা অনেক কিছু বদলেছে। আর সম্ভব হলে একটি ঐতিহাসিকের লেখা বইয়ের পাশে একটি উপন্যাস রেখে পড়ুন। একটি তথ্য দেয়, অন্যটি সময়ের স্বাদ।