বড়দের জন্য বাংলা উপন্যাস: সমাজ, রাজনীতি আর সম্পর্কের জটিল গল্প
প্রকাশিত:
বড়দের উপন্যাস বলতে এই লেখায় এমন বই ধরা হয়েছে, যেখানে ভালো আর মন্দের হিসেব সহজে মেলে না। সংসারের ভেতরের টানাপোড়েন, আদর্শের জন্য ঘর ছাড়া, একটা শহরের নানা মুখ, সমাজের বাঁধা নিয়মের সঙ্গে এক মানুষের লড়াই: এই প্রশ্নগুলো নিয়ে লেখা কয়েকটি উপন্যাস নিচে সাজানো হলো। প্রতিটি বইয়ের লেখক, প্রকাশের সাল আর বিষয় মিলিয়ে নেওয়া হয়েছে।
সম্পর্ক আর সমাজের টানাপোড়েন
চোখের বালি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস। ১৯০১ থেকে ১৯০২ সালে নবপর্যায় বঙ্গদর্শন পত্রিকায় ছাপা হওয়ার পর ১৯০৩ সালে বই হয়ে বের হয়। কেন্দ্রে আছেন বাল্যবিধবা বিনোদিনী। তাঁকে ঘিরে মহেন্দ্র, মহেন্দ্রের অল্পবয়সী স্ত্রী আশা আর বন্ধু বিহারীর জীবন জড়িয়ে যায়। উপন্যাসের মূল টান সমাজের পুরনো সংস্কারের সঙ্গে ব্যক্তির ইচ্ছার বিরোধ। কাউকে সহজে দোষী বা নির্দোষ বলা যায় না, আর সেই কারণেই বড়দের বই হিসেবে এটি আজও টাটকা।
ঘরে বাইরে বের হয় ১৯১৬ সালে, সবুজপত্র পত্রিকায়। বিমলা, তাঁর স্বামী নিখিলেশ আর নিখিলেশের বন্ধু সন্দীপকে নিয়ে গড়া এই কাহিনীর পটভূমি স্বদেশী আন্দোলন। দেশের নামে জেগে ওঠা উত্তেজনা কীভাবে একটা সংসারের ভেতরে ঢুকে সম্পর্ক ওলটপালট করে দেয়, বইটি সেটাই দেখায়।
শহরের ভেতরের জগৎ
চৌরঙ্গী শঙ্করের উপন্যাস, প্রথম প্রকাশ ১৯৬২ সালে। পটভূমি ১৯৫০-এর দশকের কলকাতা, আর গল্পের বেশিরভাগ ঘটে শাহজাহান নামের এক পুরনো হোটেলে। ইংরেজ ব্যারিস্টারের সেক্রেটারির চাকরি হারানো এক যুবক সেখানে প্রধান রিসেপশনিস্টের সহকারী হয়। অতিথি, শিল্পী আর কর্মচারীদের নানা জীবন চোখে পড়ে তার। বড়লোকি সমাজের লোভ আর অনাচার যেমন আছে, তেমনি আছে কর্মচারী ও বেকার মানুষের দারিদ্র্য। ভালোবাসা এখানে বারবার করুণ পরিণতির দিকে যায়।
গ্রাম আর নদীর মানুষ
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের (জন্ম ১৯০৮, মৃত্যু ১৯৫৬) লেখায় গ্রাম আর নদীর তীরের সাধারণ মানুষ কেন্দ্রে এসে দাঁড়ায়। পদ্মা নদীর মাঝি ১৯৩৪ সাল থেকে পূর্বাশা পত্রিকায় ধারাবাহিক বের হয়ে ১৯৩৬ সালে বই হয়। কেতুপুর গ্রাম আর পদ্মার তীরের জেলে ও মাঝিদের দারিদ্র্য, লড়াই আর দৈনন্দিন জীবন এখানে ধরা আছে। কুবের মাঝি, কপিলা আর রহস্যময় হোসেন মিয়া, যিনি ময়নাদ্বীপে নতুন এক সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখেন, উপন্যাসের প্রধান চরিত্র।
একই লেখকের পুতুলনাচের ইতিকথাও ১৯৩৬ সালে বই হয়ে বের হয়। গ্রামের তরুণ ডাক্তার শশী এখানে শহরে গিয়ে বড় কিছু করার ইচ্ছা নিয়ে শেষ পর্যন্ত গ্রামেই আটকে যায়। কুসুমের সঙ্গে তার সম্পর্ক আর গ্রামের সংস্কার, অন্ধবিশ্বাসের ছবি মিলিয়ে বইটি পাঠককে ভাবায়। এই লেখকের আরেকটি উপন্যাস জননী (১৯৩৫)।
রাজনীতি আর একটা প্রজন্মের ক্ষত
হাজার চুরাশির মা মহাশ্বেতা দেবীর উপন্যাস, ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত। সত্তরের দশকের নকশাল আন্দোলনের সময় রাষ্ট্রের হাতে প্রাণ হারান সুজাতার ছেলে ব্রতী। মর্গে তাঁর মৃতদেহের নম্বর ছিল ১০৮৪, সেখান থেকেই বইয়ের নাম। এক মা কীভাবে ছেলের পথ, ছেলের বন্ধুদের আর নিজের ভেতরের নীরবতাকে নতুন করে চিনতে শেখেন, উপন্যাস তারই গল্প। ১৯৯৮ সালে গোবিন্দ নিহালনি এটি নিয়ে হিন্দিতে চলচ্চিত্র বানান।
সমরেশ মজুমদারের কালবেলা একই সময়ের আরেক দিক দেখায়। অনিমেষ নামের এক তরুণ এখানে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে। এটি চার খণ্ডের এক উপন্যাসচক্রের দ্বিতীয় বই, আর এর জন্যই লেখক ১৯৮৪ সালে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার পান।
কোনটা দিয়ে শুরু করবেন
যাঁরা প্রথমবার বড়দের বাংলা উপন্যাস পড়ছেন, তাঁদের জন্য চোখের বালি বা চৌরঙ্গী ভালো শুরু। দুটোতেই গল্পের টান শক্ত, চরিত্র চেনা। রাজনৈতিক ইতিহাসে আগ্রহ থাকলে হাজার চুরাশির মা আর কালবেলা পরপর পড়ে দেখা যায়, কারণ একই সময়কে দুটি বই দুই দিক থেকে ধরেছে। গ্রাম আর নদীর জীবন কাছ থেকে দেখতে চাইলে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুটি উপন্যাস অপেক্ষা করছে।