চোখের বালি: রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসের কাহিনি আর চরিত্র
প্রকাশিত:
মনের ভেতরের টানাপোড়েনকে উপন্যাসের আসল বিষয় করে তোলার এক বড় উদাহরণ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চোখের বালি। কেন্দ্রে আছে বাল্যবিধবা বিনোদিনী, আর তার চারপাশের একটি পরিবার, যেখানে সে এসে পড়ে এক অস্থির ঝড়ের মতো। এই লেখায় থাকছে উপন্যাসের কাহিনি, মূল চরিত্র আর বইটি কেন আজও পড়ার মতো। শেষ পর্যন্ত কী ঘটে, সেটাও বলা আছে।
বইয়ের পরিচয়
চোখের বালি প্রথম ছাপা হয় নবপর্যায় বঙ্গদর্শন পত্রিকায়, ধারাবাহিকভাবে। প্রথম কিস্তি বেরোয় ১৯০১ সালের ১৫ মে, শেষ কিস্তি ১৯০২ সালের ২১ অক্টোবর। বই হয়ে প্রকাশিত হয় ১৯০৩ সালের ৫ এপ্রিল। লেখার সময় রবীন্দ্রনাথ নিজে এর নাম ভেবেছিলেন "বিনোদিনী"। ১৯০১ সালের মার্চে বন্ধু প্রিয়নাথ সেনকে লেখা চিঠিতে সে নামেই উল্লেখ করেছেন।
"চোখের বালি" কথাটার আক্ষরিক মানে চোখে পড়া বালুকণা, যা সারাক্ষণ খচখচ করে। উপন্যাসে এটি বিনোদিনী আর আশার মধ্যে সখীত্বের পাতানো নামও।
কাহিনির সারকথা
মহেন্দ্রের মা রাজলক্ষ্মী ছেলের জন্য বিনোদিনীকে পছন্দ করেছিলেন, কিন্তু মহেন্দ্র সে প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। বিনোদিনীর বিয়ে হয় অন্য জায়গায়, আর অল্প দিনেই সে বিধবা হয়। এদিকে মহেন্দ্রের কাকিমা অন্নপূর্ণার পছন্দের মেয়ে আশার সঙ্গে মহেন্দ্রের বিয়ে হয়। মহেন্দ্রের বন্ধু বিহারীর জন্যও প্রথমে আশার কথা ভাবা হয়েছিল, কিন্তু সে সরে দাঁড়ায়।
নববধূ আশাকে নিয়ে মহেন্দ্র এমনই মেতে ওঠে যে মা আর পড়াশোনা দুটোকেই অবহেলা করে। অভিমানে রাজলক্ষ্মী গ্রাম থেকে বিনোদিনীকে এনে সংসারের ভার দেন। বিনোদিনী শিক্ষিত, কাজে দক্ষ, কথায় ধারালো। আশার সঙ্গে তার ভাব হয়, তারা একে অন্যকে ডাকে "চোখের বালি" বলে। কিন্তু বিনোদিনীর মনের ভেতরে জমে ছিল বঞ্চনার তিক্ততা: যা আশার কপালে জুটেছে, তা তো তারও হতে পারত।
ধীরে ধীরে মহেন্দ্র বিনোদিনীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। বিহারী প্রথমেই বিনোদিনীর চালচলনে বিপদের গন্ধ পায়, মহেন্দ্রকে সতর্ক করে, ফলে দুই বন্ধুর মধ্যে ফাটল ধরে। বিহারী কলকাতা ছেড়ে চলে যায়। মহেন্দ্র সংসার ছেড়ে বিনোদিনীকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে, কিন্তু বিনোদিনী তার কাছে ধরা দেয় না। তার মন পড়ে থাকে বিহারীর দিকে।
এদিকে ফেলে আসা বাড়িতে রাজলক্ষ্মী গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। অন্নপূর্ণা ফিরে আসেন আশার পাশে দাঁড়াতে। বিহারী খুঁজে বের করে মহেন্দ্র আর বিনোদিনীকে, মহেন্দ্রকে তার কাপুরুষতার কথা মনে করায়। এক পর্যায়ে সে বিনোদিনীকে বিয়ের প্রস্তাবও দেয়। বিনোদিনী রাজি হয় না। সে জানে, এক বিধবাকে বিয়ে করলে বিহারীরই সমাজে মাথা হেঁট হবে, আর সেই বোঝা সে কারও ঘাড়ে চাপাতে চায় না।
রাজলক্ষ্মীর মৃত্যুর পর বিনোদিনী কাশীর পথে পা বাড়ায় অন্নপূর্ণার সঙ্গে। যাওয়ার আগে আশার কাছে সে ক্ষমা চায়। মহেন্দ্র ফিরে আসে আশার কাছে, আগের চেয়ে সংযত মানুষ হয়ে।
চারটি চরিত্র
- বিনোদিনী: তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, আত্মমর্যাদা আর অতৃপ্তি মিলিয়ে সে বাংলা উপন্যাসের সবচেয়ে স্মরণীয় নারীদের একজন।
- মহেন্দ্র: আদুরে, আবেগপ্রবণ, নিজের মন বুঝে উঠতে না পারা এক যুবক।
- আশা: সরল, মহেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল। কষ্টের ভেতর দিয়ে সে আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে।
- বিহারী: সংযত আর বিবেচক বন্ধু, যার মনে সম্মান আর কর্তব্যের বোধ প্রবল।
কেন এই উপন্যাস গুরুত্বপূর্ণ
বাল্যবিবাহ, নারীশিক্ষা আর বিধবার জীবন নিয়ে সমাজের প্রচলিত ধারণা এই উপন্যাসের পেছনের পটভূমি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ এখানে বক্তৃতা দেননি। ১৯৪০ সালে রবীন্দ্র-রচনাবলীর বিশ্বভারতী সংস্করণের সূচনায় তিনি লিখেছিলেন:
সাহিত্যের নবপর্যায়ের পদ্ধতি হচ্ছে ঘটনাপরম্পরার বিবরণ দেওয়া নয়, বিশ্লেষণ করে তাদের আঁতের কথা বের করে দেখানো। সেই পদ্ধতিই দেখা দিল চোখের বালিতে।
এই কারণেই বইটির আলাদা জায়গা। ঘটনা এখানে কম, চরিত্রদের মনের ভেতরটাই আসল গল্প।
অনুবাদ আর মঞ্চ-পর্দায়
রবীন্দ্রনাথের ভাইপো সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ইংরেজি অনুবাদ ১৯১৪ সালে দ্য মডার্ন রিভিউ পত্রিকায় কিস্তিতে বেরোয় "আইসোর" নামে; পরে বই আকারে নাম হয় "বিনোদিনী"। ১৯০৪ সালের ২৬ নভেম্বর কলকাতার ক্লাসিক থিয়েটারে এর নাট্যরূপ প্রথম মঞ্চে আসে। বাংলা চলচ্চিত্র হয়েছে দুবার: ১৯৩৮ সালে সতু সেনের পরিচালনায়, আর ২০০৩ সালে ঋতুপর্ণ ঘোষের পরিচালনায়।