রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিয়ে রচনা: কবি, শিক্ষক আর গানের মানুষ
প্রকাশিত:
স্কুলে "রবীন্দ্রনাথ" নিয়ে রচনা লিখতে বসলে প্রায় সবাই একই বাক্য দিয়ে শুরু করে: তিনি বিশ্বকবি। কথাটা ঠিক, তবু বড্ড ছোট। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুধু কবিতার কবি ছিলেন না। তিনি ভেবেছেন শিক্ষা নিয়ে, দেশ নিয়ে, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক নিয়ে। সেই ভাবনার কয়েকটি সুতো ধরে এখানে তাঁর পরিচয় সাজানো হলো, যাতে রচনা লেখার সময় বা এমনি পড়তে গিয়ে একটা পরিষ্কার ছবি পাওয়া যায়।
কবি, কিন্তু শুধু কবি নন
লেখালেখি শুরু অল্প বয়সেই। ১৮৭৪ সালে ছাপা হয় প্রথম কবিতা, ১৮৭৮ সালে প্রথম কাব্যগ্রন্থ। এরপর জীবনের শেষ পর্যন্ত তিনি কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, নাটক আর প্রবন্ধে বাংলা ভাষাকে ভরিয়ে তুলেছেন। শেষ বয়সেও থামেননি: পুনশ্চ (১৯৩২), শেষ সপ্তক (১৯৩৫), আরোগ্য আর জন্মদিনে (১৯৪১) তার সাক্ষী।
সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান ১৯১৩ সালে। প্রথম অ-ইউরোপীয় আর প্রথম এশীয় হিসেবে। এই পুরস্কারের চেয়েও বড় কথা, বাংলা ভাষা তখন থেকে পৃথিবীর কাছে একটু বেশি পরিচিত।
গানের মানুষ
তাঁর গান বাঙালির ঘরোয়া জীবনের অংশ। বর্ষা থেকে বসন্ত, আনন্দ থেকে বিষাদ, প্রায় প্রতিটি মুহূর্তের জন্য একটা রবীন্দ্রসংগীত খুঁজে পাওয়া যায়। গীতবিতান-এ সংকলিত গানের সংখ্যা ধরা হয় ১৯১৫। একজন কবির দুটি গান আজ দুই দেশের জাতীয় সংগীত: ভারত নিয়েছে "জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে", বাংলাদেশ নিয়েছে "আমার সোনার বাংলা"। ভাবলে সত্যিই বিস্ময় লাগে।
স্কুল, যেখানে পড়াশোনা ছিল অন্যরকম
নিজে স্কুলের বাঁধা নিয়মে স্বস্তি পাননি বলেই হয়তো শিক্ষা নিয়ে তাঁর ভাবনা এত তীব্র ছিল। ১৯০১ সালে শান্তিনিকেতনে তিনি যে বিদ্যালয় শুরু করেন, তার আদর্শ ছিল প্রাচীন তপোবনের শিক্ষা: ছাত্র শুধু পুঁথি মুখস্থ করবে না, তার পুরো মানুষটাই বেড়ে উঠবে। সেখান থেকে ১৯২১ সালে জন্ম নেয় বিশ্বভারতী, যার মূল ভাবনা ছিল ভারতের সঙ্গে সারা বিশ্বের মিলনক্ষেত্র গড়ে তোলা। আজ সেটি দেশের একটি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
দেশপ্রেম নিয়ে তাঁর প্রশ্ন
স্বদেশের জন্য ভালোবাসা তাঁর কোনোদিন কম ছিল না। বঙ্গভঙ্গের বছর ১৯০৫ সালে ছাপা হয় "আমার সোনার বাংলা"। কিন্তু জাতীয়তাবাদের সংকীর্ণ রূপ নিয়ে তিনি বারবার প্রশ্ন তুলেছেন। ১৯১৭ সালে ন্যাশনালিজম নামে তাঁর বই বের হয়, যেখানে এ নিয়ে তাঁর নিজের কথা আছে। ১৯১৫ সালে ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া নাইট উপাধি তিনি ১৯১৯ সালে ফিরিয়ে দেন জালিয়ানওয়ালাবাগের ঘটনার প্রতিবাদে। ১৯৩৭ সালের কালান্তর বইটিও তাঁর সমাজ ও সময় নিয়ে ভাবনার জায়গা।
রঙ আর রেখার জগৎ
কবিতা-গানের পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ ছবিও এঁকেছেন, প্রায় দুই হাজার। কবিতার মতো ছবিতেও তাঁর নিজস্ব ভঙ্গি ছিল, প্রচলিত কোনো ছাঁচে ফেলা কঠিন। একজন লেখক শুধু কথায় নয়, রেখা আর রঙেও নিজেকে প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন, এটা জানলে তাঁর সৃষ্টির পরিধি আরও স্পষ্ট হয়।
আজ কেন পড়ব
রবীন্দ্রনাথকে একবারে পড়ে শেষ করা যায় না। একেক বয়সে একেক লেখা নতুন করে ধরা দেয়। ছোটবেলায় কাবুলিওয়ালা গল্পটা মন ভিজিয়ে দিতে পারে, বড় হয়ে হয়তো টানবে শেষের কবিতা-র ভাষা বা ঘরে বাইরে-র প্রশ্নগুলো। কোথা থেকে শুরু করবেন, তা নিয়ে ভাবতে হবে না: রবীন্দ্রনাথ এমন লেখক, যাঁকে যেকোনো একটা জায়গা থেকে ধরা যায়।