গীতাঞ্জলি: রবীন্দ্রনাথের কাব্যগ্রন্থ আর নোবেল পুরস্কারের গল্প

গীতাঞ্জলি: রবীন্দ্রনাথের কাব্যগ্রন্থ আর নোবেল পুরস্কারের গল্প

গীতাঞ্জলি নামটার ভেতরেই বইয়ের মেজাজ লুকিয়ে আছে: গীত আর অঞ্জলি, অর্থাৎ গানের অর্ঘ্য, দুই হাত ভরে ঈশ্বরের কাছে নিবেদন করা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই বইটি বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে পরিচিত কাব্যগ্রন্থগুলির একটি। অথচ গীতাঞ্জলি বলতে আসলে দুটো আলাদা বই বোঝায়, একটি বাংলায়, আরেকটি ইংরেজিতে। দুটোর পার্থক্য জানা না থাকলে গোলমাল হয়ে যায়।

১৯১০ সালের বাংলা গীতাঞ্জলি

বাংলা গীতাঞ্জলি প্রকাশিত হয় ১৯১০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর (ভাদ্র ১৩১৭)। বইটিতে আছে ১৫৭টি গান ও কবিতা। বেশির ভাগই লেখা হয়েছে শিলাইদহ, শান্তিনিকেতন আর কলকাতায় বসে, এবং অনেকগুলো আগে ১৯০৮ আর ১৯০৯ সালে বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল।

এই বইয়ের প্রথম কবিতাটিই অনেকের মুখস্থ:

আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার
চরণ-ধূলার তলে।
সকল অহঙ্কার হে আমার
ডুবাও চোখের জলে।

এখানে কবি কোনো বড় দাবি নিয়ে আসেননি। তিনি চেয়েছেন নিজের অহংকার ভেঙে যাক। এই বিনয়ের সুরই বইয়ের বড় অংশে ছড়িয়ে আছে।

ভরসা আর আনন্দের কথা

গীতাঞ্জলির কবিতাগুলি প্রার্থনার ঢঙে লেখা, কিন্তু প্রার্থনার বিষয় চমকে দেয়। বিপদ থেকে বাঁচাতে বলেননি, বলেছেন বিপদে ভয় না পাওয়ার শক্তি দিতে:

বিপদে মোরে রক্ষা কর,
এ নহে মোর প্রার্থনা,
বিপদে আমি না যেন করি ভয়।

আবার আছে খুশির কবিতাও। জগতে নিমন্ত্রণ পাওয়ার আনন্দ ধরা আছে এই দুটি পঙ্‌ক্তিতে:

জগতে আনন্দ যজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ।
ধন্য হল ধন্য হল মানব-জীবন।

এই তিনটি অংশ নেওয়া হয়েছে বাংলা উইকিসংকলনে থাকা গীতাঞ্জলির ১৯১৩ সালের পাঠ থেকে, সেখানকার প্রথম, চতুর্থ আর পঁয়তাল্লিশ সংখ্যক কবিতা। কবিতাগুলিতে প্রকৃতির ছবি আছে, বর্ষা আছে, শরৎ আছে, আর আছে বারবার ফিরে আসা সেই "তুমি", যার কাছে কবি নিজেকে সঁপে দিচ্ছেন।

ইংরেজি গীতাঞ্জলি আর নোবেল পুরস্কার

ইংরেজি গীতাঞ্জলি বাংলা বইয়ের হুবহু অনুবাদ নয়। শিলাইদহে অসুস্থতা সারানোর দিনগুলোতে রবীন্দ্রনাথ নিজেই কবিতা ইংরেজিতে রূপান্তর করতে শুরু করেন। সরল ইংরেজিতে কখনো কবিতা ছোট করেছেন, কখনো ভাবটুকু ধরে নতুন করে লিখেছেন। যে পাণ্ডুলিপি নিয়ে তিনি ১৯১২ সালে লন্ডনে যান, তাতে ছিল ১০৩টি কবিতা। এর মধ্যে ৫৩টি বাংলা গীতাঞ্জলি থেকে নেওয়া, বাকিগুলো এসেছে নৈবেদ্য, খেয়া, গীতিমাল্যসহ আরও কয়েকটি বই থেকে।

লন্ডনে পাণ্ডুলিপি তুলে দেওয়া হয় শিল্পী উইলিয়াম রোদেনস্টাইনের হাতে। তিনি কয়েকটি টাইপ-করা কপি করিয়ে কবি ইয়েটসসহ আরও কয়েকজনকে পড়তে দেন। ইয়েটস পরে ইংরেজি বইয়ের ভূমিকা লেখেন। ১৯১২ সালে লন্ডনের ইন্ডিয়া সোসাইটি বইটি প্রথম প্রকাশ করে, আর ১৯১৩ সালে বেরোয় ম্যাকমিলান সংস্করণ।

১৯১৩ সালের ১০ নভেম্বর ঘোষণা হয়, সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কারণ হিসেবে ইংরেজিতে অনূদিত গীতাঞ্জলির কথা ধরা হয়েছিল। তিনি প্রথম অ-ইউরোপীয় হিসেবে এই পুরস্কার পান।

কোথা থেকে পড়বেন

বাংলা পড়তে পারলে গীতাঞ্জলি পড়ার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো ধীরে ধীরে, একটা-দুটো কবিতা করে। এগুলো তাড়াহুড়ো করে পড়ার বই নয়। তাঁর অন্য রচনার দিকে যেতে চাইলে নাটক ডাকঘর আর রক্তকরবী দিয়েও শুরু করা যায়।