কিশোরদের জন্য বই লেখার পরামর্শ: বাংলা কিশোর সাহিত্যের উদাহরণ থেকে

কিশোরদের জন্য বই লেখার পরামর্শ: বাংলা কিশোর সাহিত্যের উদাহরণ থেকে

কিশোরদের জন্য লেখা মানে ছোটদের গল্পকে একটু লম্বা করা নয়, আবার বড়দের গল্পকে সরল করে বলাও নয়। বাংলায় এই ধারার সবচেয়ে পরিচিত বইগুলো থেকে কয়েকটি সিদ্ধান্ত ধরে ধরে দেখা যায়, লেখক কী কী ঠিক করে নিলে গল্প দাঁড়ায়। নিচের পরামর্শগুলো সেই সিদ্ধান্তের হিসেবে সাজানো।

আগে ঠিক করুন পাঠকের বয়স

"কিশোর" বলতে এগারো বছরের পাঠকও বোঝায়, সতেরো বছরেরও। দুজনের জন্য এক গল্প চলে না। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি কিশোর মনোজ আর তার অদ্ভুত পরিবারের হালকা, মজার গল্প। মুহম্মদ জাফর ইকবালের আমার বন্ধু রাশেদ একাত্তরের যুদ্ধের পটভূমিতে অনেক ভারী বিষয় নিয়ে। দুটোই কিশোর সাহিত্য, কিন্তু পাঠক আলাদা। বয়স ঠিক করলে ভাষা, বিষয় আর বইয়ের দৈর্ঘ্য প্রায় আপনিই ঠিক হয়ে যায়।

নায়কের একটি স্পষ্ট চাওয়া দিন

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের চাঁদের পাহাড় তরুণ শঙ্করকে নিয়ে। স্নাতক হয়ে পাটকলে চাকরি পাওয়ার পরও সে রোমাঞ্চের খোঁজে বেরিয়ে পড়তে চায়। একটা চাওয়া, তার সামনে একটা বাধা: গল্প এইটুকু থেকেই চলতে শুরু করে। প্রথম অধ্যায়েই আপনার নায়ক কী চায়, আর কী তাকে আটকাচ্ছে, পরিষ্কার করে রাখুন। পাঠক বিরক্ত হয় তখনই, যখন সে বুঝতে পারে না চরিত্রটি কেন এই পথে হাঁটছে।

কার চোখে গল্প বলবেন

ফেলুদার গল্প বলে তার ভাই ও সহকারী তপেশ, ডাকনামে তপসে। কাকাবাবুর সঙ্গে আছে ভাইপো সন্তু। দুটি ক্ষেত্রেই বুদ্ধিমান বড় চরিত্রটি নিজে কথক নয়, কথক একজন কম জানা সঙ্গী। এতে পাঠকের একটা সুবিধা হয়: সে কথকের সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করে, ধাঁধা দেখে আর শেষে চমকে ওঠে। কিশোর চরিত্রকে প্রধান করলে তার সীমিত বোঝাপড়াকে কাজে লাগান; সবজান্তা কথক কিশোর পাঠককে দূরে ঠেলে দেয়।

অধ্যায়ের শেষে একটি টান রাখুন

ফেলুদার প্রথম গল্প ১৯৬৫ থেকে ১৯৬৬ সালে সন্দেশ পত্রিকায় বেরিয়েছিল, কাকাবাবুর প্রথম গল্পটি এসেছিল আনন্দমেলার ১৯৭১ সালের পূজাসংখ্যায়। পত্রিকার পাতায় পড়া গল্পের একটা দাবি আছে: প্রতিটি অংশ এমন জায়গায় থামা চাই, যেখানে পাঠক পরের সংখ্যার জন্য অপেক্ষা না করে পারে না। বই হিসেবে লিখলেও এই কৌশল কাজে লাগে।

ভাষা আর পরিবেশ নিজের মাটির হোক

  • চলিত ভাষা, ছোট বাক্য রাখুন, কিন্তু কিশোর পাঠককে বোকা ভাববেন না। কঠিন শব্দ এলে প্রসঙ্গ দিয়েই বুঝিয়ে দিন।
  • সংলাপ জোরে পড়ে দেখুন। ঠিক কিশোরের মুখে যা শোনায় না, তা বদলান।
  • স্কুল, পাড়া, পূজা বা ঈদের ছুটি, পরীক্ষার চাপ: আপনার পাঠক যে জগৎ চেনে, সেখান থেকে ঘটনা নিন। অন্য দেশের কিশোর-গল্পের ছাঁচ হুবহু বসালে গল্প ধার-করা শোনায়।

হাসি আর ভয়ের মাপ

শীর্ষেন্দুর ছোটদের লেখায় ভূত, অদ্ভুত বাড়ি আর অদ্ভুত মানুষ আছে, কিন্তু ভয়ের চেয়ে হাসিই বেশি। শিশুসাহিত্যের জন্য তিনি ১৯৮৫ সালে বিদ্যাসাগর পুরস্কার পান। এর শিক্ষা হলো, কিশোর গল্পে অদ্ভুত পরিস্থিতির ভেতরে একজন খুব সাধারণ ছেলে বা মেয়েকে রাখলে মজা আপনিই আসে।

কঠিন বিষয় লেখার সময়

আমার বন্ধু রাশেদে যুদ্ধের কথা আসে স্কুলছাত্রদের চোখ দিয়ে, মফস্বল শহরের পরিচিত রাস্তা আর বন্ধুদের মধ্য দিয়ে। এভাবে লিখলে বড় ইতিহাসও ছোট মানুষের গল্প হয়ে ওঠে। কঠিন বিষয়ে লিখতে গেলে সাল, জায়গা আর ঘটনা আগে যাচাই করুন। নির্মম দৃশ্য খুলে না দেখিয়ে তার প্রভাব দেখান, আর শেষে উপদেশ জুড়ে দেবেন না। পাঠক নিজেই বোঝে।

লেখা শেষ হলে

পাণ্ডুলিপি একজন সত্যিকারের কিশোর পাঠককে পড়ান, আর যেখানে সে থেমে গেল বা বিরক্ত হলো, সেই জায়গা কাটুন বা ছোট করুন। তারপর কিশোর পত্রিকা আর পূজাসংখ্যায় লেখা পাঠানোর নিয়ম দেখে নিন। এ ধরনের বইয়ের উদাহরণ খুঁজতে কিশোর সাহিত্য শ্রেণিটি দেখতে পারেন।