জীবনানন্দ দাশের কবিতা: বনলতা সেন থেকে রূপসী বাংলা
প্রকাশিত:
জীবনানন্দ দাশের জীবনের কথা অন্য লেখায় আছে। এখানে শুধু কবিতার কথা: কোন বইয়ে কোন কবিতা পাওয়া যায়, কোনটা দিয়ে শুরু করা যায়, আর পড়ার সময় কী চোখে পড়ে। সুবিধার জন্য তাঁর বইগুলো ধরে ধরেই এগোনো যাক। কবিতাগুলো কোন বইয়ের, সেই হিসাব নেওয়া হয়েছে কবির ভূমিকাসহ ১৯৫৪ সালের "শ্রেষ্ঠ কবিতা" সংকলন থেকে, যেখানে বাছাই কবিতাগুলো তাঁর পাঁচটি বই অনুযায়ী সাজানো।
ঝরা পালক: শুরুর কবিতা
১৯২৭ সালে প্রকাশিত ঝরা পালক জীবনানন্দের প্রথম কাব্যগ্রন্থ। এতে কাজী নজরুল ইসলাম, মোহিতলাল মজুমদার ও সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের প্রভাব স্পষ্ট। "নীলিমা", "পিরামিড", "সেদিন এ-ধরণীর" এই বইয়েরই কবিতা। জীবনানন্দের নিজস্ব সুর তখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি, কিন্তু তাঁর কবিতার দিকে যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে বইটি পড়ার মতো।
ধূসর পাণ্ডুলিপি: নিজের কণ্ঠস্বর
১৯৩৬ সালের ধূসর পাণ্ডুলিপিতে এসেই কবি নিজের কাব্যশৈলী পেয়ে যান। "মৃত্যুর আগে", "বোধ", "নির্জন স্বাক্ষর", "ক্যাম্পে", "মাঠের গল্প" এই বইয়ের কবিতা। বিশেষ করে "বোধ" কবিতায় আলো-অন্ধকারের মধ্য দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কবি টের পান, স্বপ্ন নয়, শান্তি নয়, ভালোবাসাও নয়, অন্য কোনো এক বোধ তাঁর ভেতরে কাজ করছে। এই অস্থির বোধটা বুঝতে পারলে জীবনানন্দের অনেক কবিতার দরজা খুলে যায়।
বনলতা সেন: সবচেয়ে প্রিয় বই
১৯৪২ সালে কবিতা ভবন থেকে বের হয় বনলতা সেন। এই বইয়ের জন্য তিনি রবীন্দ্র-স্মৃতি পুরস্কার পেয়েছিলেন। শিরোনামের কবিতাটি প্রথম ছাপা হয় "কবিতা" পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যায়, ১৩৪২ বঙ্গাব্দের পৌষে। কবিতার শুরুটা এমন:
হাজার বছর ধ’রে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,
(বনলতা সেন)
ক্লান্ত এক পথিক সিংহল থেকে মালয় সাগর, বিম্বিসার-অশোকের জগৎ থেকে বিদর্ভ নগর ঘুরে এসে নাটোরের বনলতা সেনের কাছে দু-দণ্ড শান্তি পায়। দিনের শেষে সন্ধ্যা নামে, পাখিরা ঘরে ফেরে, জীবনের সব লেনদেন ফুরোয়, থাকে শুধু অন্ধকার আর মুখোমুখি বসে থাকা। এই বইয়ের আরও কবিতা "পথ হাঁটা", "আমাকে তুমি", "সুরঞ্জনা", "সবিতা" ও "সুচেতনা"।
মহাপৃথিবী: ফেরার আকুলতা
১৯৪৪ সালের মহাপৃথিবীতে পাওয়া যায় "হায় চিল", "ঘাস", "হাওয়ার রাত", "বুনো হাঁস", "শঙ্খমালা" আর "আট বছর আগের একদিন"। "হায় চিল" শুরু হয় এই পঙ্ক্তিতে:
হায় চিল, সোনালি ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে
(হায় চিল)
এক ভেজা দুপুরে নদীর ধারে চিলের ডাক কবির মনে হারিয়ে যাওয়া একজনকে ফিরিয়ে আনে। "আট বছর আগের একদিন" একটু আলাদা: এক গৃহস্থের হঠাৎ চলে যাওয়ার খবর দিয়ে কবিতাটি শুরু হয়, তারপর ধীরে ধীরে জীবনের অর্থ নিয়ে এক বড় প্রশ্নে পৌঁছোয়। জীবনানন্দের কবিতা যে শুধু প্রকৃতির নয়, মানুষের মনেরও, এই কবিতা তার ভালো প্রমাণ।
সাতটি তারার তিমির
১৯৪৮ সালের এই বইটিই কবির জীবদ্দশায় প্রকাশিত শেষ মূল কাব্যগ্রন্থ। এখানে আছে "আকাশলীনা", "নাবিকী", "সময়ের কাছে", "সৃষ্টির তীরে" ও আরও অনেক কবিতা।
রূপসী বাংলা: মৃত্যুর পরে পাওয়া বই
রূপসী বাংলার কবিতাগুলো ১৯৩৪ সালে লেখা, কিন্তু কবি এগুলো ছাপাননি। তাঁর মৃত্যুর পর পাণ্ডুলিপির খাতা পাওয়া যায়, আর ১৯৫৭ সালে সিগনেট প্রেস বইটি প্রকাশ করে। কবি নিজে এর নাম ঠিক করেছিলেন "বাংলার ত্রস্ত নীলিমা", ছাপার সময় নাম বদলে "রূপসী বাংলা" রাখা হয়। বইয়ের একটি সনেট শুরু হয় বাংলায় ফিরে আসার এই প্রতিজ্ঞায়:
আবার আসিব ফিরে ধানসিড়িটির তীরে
(রূপসী বাংলা)
পরের লাইনগুলোতে কবি ভাবেন, মানুষ হয়ে না এলেও হয়তো শঙ্খচিল, শালিখ বা কার্তিকের ভোরের কাক হয়ে তিনি এই নদী-মাঠ-ক্ষেতের দেশেই ফিরবেন। বইটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছিল।
কোথা থেকে শুরু করবেন
১৯৫৪ সালের মে মাসে বের হয় "জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা", কবির নিজের লেখা ভূমিকাসহ। বইটি ১৯৫৫ সালে মরণোত্তর সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার পায়। প্রথম পাঠের জন্য শ্রেষ্ঠ কবিতা সংকলনের মতো বই সুবিধার, কারণ এক মলাটেই পাঁচটি বইয়ের বাছাই কবিতা মেলে। ভালো লাগলে একটি একটি করে মূল কাব্যগ্রন্থে ঢুকে পড়ুন। আর কবিতা না বুঝলেও ঘাবড়ানোর কিছু নেই, জীবনানন্দকে প্রথমে ছবির মতো পড়তে হয়: ঘাস, চিল, নদী, কুয়াশা, আর তার ভেতরে একলা এক মানুষ।