জীবনানন্দ দাশ: জীবন, কাব্যগ্রন্থ আর কবিতার সুর
প্রকাশিত:
জীবনানন্দ দাশ জীবদ্দশায় যথেষ্ট স্বীকৃতি পাননি, অথচ আজ তাঁকে রবীন্দ্রনাথ-পরবর্তী বাংলা কবিতার প্রধান কবিদের একজন বলে মানা হয়। তাঁর কবিতায় বাংলার নদী, মাঠ, ধানখেত, শালিক আর হিজলের ছায়া যেমন আছে, তেমনি আছে একা মানুষের ক্লান্তি, প্রেম আর সময়ের দিকে তাকিয়ে থাকা এক গভীর বিষণ্ণতা।
জন্ম, পড়াশোনা আর কর্মজীবন
জীবনানন্দ দাশের জন্ম ১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি, বরিশালে। বরিশাল তখন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অংশ, আজ বাংলাদেশের একটি বিভাগীয় শহর। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি কলকাতায় যান। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজিতে স্নাতক এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন।
জীবিকার জন্য তিনি সারা জীবন ইংরেজির শিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন। কলকাতার সিটি কলেজ, দিল্লির রামযশ কলেজ, বরিশালের ব্রজমোহন কলেজসহ নানা কলেজে পড়িয়েছেন। চাকরি বারবার বদলেছে, অর্থকষ্ট প্রায় কখনো পিছু ছাড়েনি। কবি হিসেবে স্বীকৃতিও এসেছে ধীরে, অনেক সমালোচনার ভেতর দিয়ে।
১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর কলকাতায় ট্রামের ধাক্কায় তিনি গুরুতর আহত হন। আট দিন পর, ২২ অক্টোবর, তাঁর মৃত্যু হয়।
তাঁর কাব্যগ্রন্থ
জীবনানন্দের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ঝরা পালক বের হয় ১৯২৭ সালে। এরপর আসে ধূসর পাণ্ডুলিপি (১৯৩৬) এবং বনলতা সেন (১৯৪২)। "বনলতা সেন" নামের কবিতাটি আজও বাংলা ভাষার সবচেয়ে প্রিয় প্রেমের কবিতাগুলোর একটি। পরে প্রকাশিত হয় মহাপৃথিবী (১৯৪৪) আর সাতটি তারার তিমির (১৯৪৮)।
তাঁর বহু কবিতা জীবদ্দশায় ছাপা হয়নি। মৃত্যুর পর পাণ্ডুলিপি থেকে প্রকাশিত হয় রূপসী বাংলা (১৯৫৭)। এই বইয়ের সনেটগুলোতে বাংলার গ্রাম আর প্রকৃতির যে ছবি, তার জন্যই পাঠক তাঁকে ভালোবেসে ডাকেন "রূপসী বাংলার কবি"।
কবিতার মূল সুর
জীবনানন্দের কবিতা পড়লে প্রথমেই চোখে পড়ে তাঁর ছবি আঁকার ক্ষমতা। একটি পঙ্ক্তিতেই তিনি সন্ধ্যার আলো, ভিজে ঘাস বা নদীর ধারের কোনো পাখিকে এমনভাবে আনেন যে দৃশ্যটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। প্রকৃতি তাঁর কাছে শুধু পটভূমি নয়, মানুষের মনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক জীবন্ত জগৎ।
প্রেম তাঁর কবিতার আরেকটি বড় জায়গা। সেই প্রেমে পাওয়ার আনন্দের চেয়ে না পাওয়ার ব্যথা, দূরত্ব আর স্মৃতির টান বেশি। সঙ্গে আছে সময়, মৃত্যু আর জীবনের অর্থ নিয়ে এক অবিরাম প্রশ্ন। আধুনিক শহুরে মানুষের একাকীত্ব আর ক্লান্তিকে তিনি যেভাবে কবিতায় ধরেছেন, তা বাংলা কবিতায় এক নতুন স্বর এনেছিল।
এই কারণেই তাঁর কবিতা প্রথম পাঠে সহজ নয়, কিন্তু একবার মন বসে গেলে বারবার ফিরে পড়তে ইচ্ছে করে। যাঁরা শুরু করতে চান, তাঁদের জন্য "বনলতা সেন" আর "রূপসী বাংলা" ভালো প্রথম পা।