কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা: বিদ্রোহী থেকে দোলনচাঁপা

কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা: বিদ্রোহী থেকে দোলনচাঁপা

কাজী নজরুল ইসলাম কবিতা লিখেছেন আগুনের কলমে, আবার ভোরের হাওয়ার মতো নরম সুরেও। একই কবির হাতে "বিদ্রোহী"র হুঙ্কার আর প্রেম-বিরহের মৃদু গুঞ্জন জন্ম নিয়েছে, এটাই তাঁর কবিতাকে এত বড় করেছে। এই লেখায় সেই কবিতাগুলো কোন বইয়ে আছে, কবে আর কোন পরিস্থিতিতে লেখা হয়েছিল, তা দেখা যাক।

কবির কথা সংক্ষেপে

নজরুলের জন্ম ১৮৯৯ সালের ২৪ মে, বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে। স্কুলের পড়া শেষ হওয়ার আগেই ১৯১৭ সালে তিনি ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন, ফেরেন ১৯২০ সালে। এরপর কলকাতায় সাংবাদিকতা, সভা-সমিতি আর লেখালেখি। ১৯২২ সালের আগস্টে নিজেই বের করেন "ধূমকেতু" পত্রিকা। ওই পত্রিকায় ছাপা একটি রাজনৈতিক কবিতার জেরে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়, ১৯২৩ সালের জানুয়ারিতে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়।

১৯৪২ সালে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন, তারপর আর কখনো লিখতে পারেননি। ১৯৭২ সালে তাঁকে সপরিবারে ঢাকায় আনা হয়, সেখানেই ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট তাঁর মৃত্যু হয়। সক্রিয় সাহিত্যজীবন ছিল মাত্র তেইশ বছরের, অথচ এর ভেতরেই তিনি বাংলা কবিতা আর গানের ধারা বদলে দিয়েছেন।

বিদ্রোহী: যে কবিতা রাতারাতি তাঁকে চিনিয়ে দিল

"বিদ্রোহী" লেখা হয় ১৯২১ সালের ডিসেম্বরে। ছাপা হয় ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি, "বিজলী" পত্রিকায়। কবিতার শুরুটাই এমন:

বল উন্নত মম শির!

(বিদ্রোহী, অগ্নিবীণা)

দীর্ঘ এই কবিতায় কবি নিজেকে একসঙ্গে ঝড়, নটরাজ, সন্ন্যাসী আর সৈনিক বলে পরিচয় দিয়েছেন। পুরাণ, ইতিহাস আর দুনিয়ার নানা প্রান্তের ছবি এক নিঃশ্বাসে এসে জড়ো হয়েছে। ছাপা হওয়ার পর কবিতাটি ব্যাপক সাড়া ফেলে, ওই সংখ্যার "বিজলী"কে পরপর দুইবার ছাপতে হয়েছিল।

অগ্নিবীণা

অগ্নিবীণা প্রকাশিত হয় ১৯২২ সালের অক্টোবরে। বইয়ে বারোটি কবিতা: প্রলয়োল্লাস, বিদ্রোহী, রক্তাম্বর-ধারিণী মা, আগমনী, ধূমকেতু, কামাল পাশা, আনোয়ার, রণভেরী, শাত-ইল-আরব, খেয়াপারের তরণী, কোরবানি আর মোহররম। বইটি উৎসর্গ করা হয় বিপ্লবী বারীন্দ্রকুমার ঘোষকে।

একটু গোলমাল এড়ানো দরকার: "ধূমকেতু" নামে নজরুলের একটি কবিতাও আছে (অগ্নিবীণায়), আবার একই নামে তাঁর সম্পাদিত পত্রিকাও ছিল। দুটো আলাদা জিনিস।

ভাঙার গান

ভাঙার গান বের হয় ১৯২৪ সালের আগস্টে। কয়েক মাসের মধ্যেই, ১১ নভেম্বর, তৎকালীন বঙ্গীয় সরকার বইটি বাজেয়াপ্ত করে নিষিদ্ধ করে, আর সেই নিষেধাজ্ঞা ব্রিটিশ সরকার কখনো তোলেনি। দ্বিতীয় সংস্করণ বেরোতে বেরোতে ১৯৪৯ সাল। বইয়ের প্রথম কবিতা "কারার ঐ লৌহ-কপাট" কবি লিখেছিলেন ১৯২১ সালের ডিসেম্বরে। মুজফ্‌ফর আহমদের স্মৃতিকথা অনুযায়ী, একটি পত্রিকার জন্য কবিতা চাওয়া হলে নজরুল বন্ধুদের সামনেই বসে তখনই তা লিখে ফেলেন।

দোলনচাঁপা: নরম সুরের নজরুল

"দোলনচাঁপা" একটি ফুলের নাম, যে ফুল সন্ধ্যায় ফোটে আর হালকা মিষ্টি সুবাস ছড়ায়। দোলনচাঁপা কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৯২৩ সালের সেপ্টেম্বরে, নজরুলের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ হিসেবে। বলা হয়, এর কবিতাগুলো লেখা হয়েছিল কারাবাসের দিনগুলোতে, আর বন্ধুরা কৌশলে সেগুলো বাইরে বের করে এনেছিলেন। প্রথম সংস্করণে ছিল উনিশটি কবিতা, পরের সংস্করণগুলোতে সংখ্যা বেড়ে হয় পঞ্চাশ।

এখানে আগুনের চেয়ে মনের নরম দিকটাই বেশি। কবিতার নামগুলোই তার আভাস দেয়: ব্যথা গরব, সমর্পণ, পূজারিণী, শেষ প্রার্থনা। এর পরের বই "ছায়ানট" (১৯২৫) পঞ্চাশটি কবিতা নিয়ে সাজানো, যেখানে বিজয়িনী, চৈতী হাওয়া আর পলাতকার মতো কবিতা আছে।

সঞ্চিতা দিয়ে শুরু করলে

নজরুলকে প্রথমবার পড়তে চাইলে সঞ্চিতা সবচেয়ে সুবিধার। এটি তাঁর নিজের বাছাই করা সংকলন, আটাত্তরটি কবিতা আর সতেরোটি গান নিয়ে। বিদ্রোহী, সাম্যবাদী, সর্বহারা, মানুষ, জীবন বন্দনা, খুকী ও কাঠবেড়ালী, চল্‌ চল্‌ চল্‌, সবই এখানে পাওয়া যায়। বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে।

কবিতার পাশাপাশি তাঁর গানের কথাও মনে রাখা দরকার। নজরুলগীতির সংখ্যা চার হাজারেরও বেশি। তবু পাতায় পড়লেও বোঝা যায়, তাঁর কবিতার ছন্দ নিজেই যেন সুর হয়ে বাজে।