কাজী নজরুল ইসলামের বাণী: মূল পঙ্ক্তি আর ভাবনার কথা
প্রকাশিত:
নজরুল ইসলামের নামে ইন্টারনেটে যেসব "উক্তি" ঘুরে বেড়ায়, তার অনেকগুলোই আসলে ইংরেজি থেকে ফের বাংলায় ফেরানো বাক্য, মূল কবিতায় যার খোঁজ মেলে না। এখানে তেমন কিছু রাখা হয়নি। "বিদ্রোহী" কবিতার যে কয়েকটি পঙ্ক্তি আছে, সেগুলো কবির নিজের লেখা, বাংলা উইকিসোর্সে প্রকাশিত মূল পাঠ থেকে মিলিয়ে নেওয়া। বাকিটা তাঁর ভাবনার কথা, আমার নিজের ভাষায়।
বিদ্রোহী কবিতার তিনটি আহ্বান
কাজী নজরুল ইসলামের সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত পঙ্ক্তিগুলো "বিদ্রোহী" কবিতার। কবিতার শুরুতেই আছে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর ডাক:
বল উন্নত মম শির!
(বিদ্রোহী)
কবিতা জুড়ে এই ডাক ফিরে ফিরে আসে একটি ধুয়ার মতো, শেষ পর্যন্ত যা দাঁড়ায় আত্মপরিচয়ে:
আমি চির-উন্নত শির।
(বিদ্রোহী)
আর এই বিদ্রোহ যে শুধু ভাঙার জন্য নয়, তার জবাব আছে কবিতার প্রায় শেষে। কবি বলছেন, কখন তিনি শান্ত হবেন:
আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না,
(বিদ্রোহী, অগ্নিবীণা)
এই কয়েকটি লাইনেই নজরুলের মূল কথা ধরা আছে। বিদ্রোহ এখানে নিজের জন্য নয়, উৎপীড়িত মানুষের জন্য। তাদের কান্না থামলেই কবির লড়াই থামবে।
ধূমকেতুর জন্য রবীন্দ্রনাথের আশীর্বাদ
১৯২২ সালে নজরুল "ধূমকেতু" পত্রিকা বের করলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে আশীর্বাদ জানিয়ে লেখেন:
আয় চলে আয়রে ধূমকেতু।
আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু,
(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
এই বাণী পত্রিকার প্রথম পাতার মাথায় ছাপা হতো। এটি নজরুলের নয়, রবীন্দ্রনাথের পঙ্ক্তি, কিন্তু নজরুলকে বুঝতে হলে এটিও জানা দরকার, কারণ তরুণ কবিকে সেই সময়ের সবচেয়ে বড় কবি কীভাবে দেখেছিলেন, তা এখানে ধরা আছে।
পঙ্ক্তির বাইরে তাঁর ভাবনা
নজরুলের কবিতা, গান আর জীবন থেকে যেসব ভাবনা বারবার ফিরে আসে, সেগুলো কয়েকটি কথায় সাজানো যায়।
- উৎপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণ আর সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে তিনি সরাসরি লিখেছেন। এ জন্য ১৯২৩ সালে তাঁকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড পেতে হয়। আদালতে তাঁর জবানবন্দিতে নিজেকে কবি বলে পরিচয় দিয়ে সত্য প্রকাশের কথা তিনি বলেছিলেন।
- সাম্যের স্বপ্ন। রাশিয়ার বিপ্লব তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। তাঁর সম্পাদিত "লাঙ্গল" আর "গণবাণী" পত্রিকায় "সাম্যবাদী" ও "সর্বহারা" নামের কবিতাগুচ্ছ ছাপা হয়। সাম্যের ডাকই ছিল এসব লেখার মূল সুর।
- ধর্মের নামে গোঁড়ামির বিরোধিতা। মুসলিম পরিবারে জন্ম নিয়েও তিনি অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বড় হন। নিজের চার ছেলের নাম রেখেছিলেন বাংলা, আরবি আর ফারসি মিলিয়ে: কৃষ্ণ মুহম্মদ, অরিন্দম খালেদ, কাজী সব্যসাচী ও কাজী অনিরুদ্ধ। নামগুলোই তাঁর বিশ্বাসের ঘোষণা।
- নারী-পুরুষের সমতা। তাঁর কবিতা ও গানের একটি বড় সুর মানুষের মর্যাদা, আর সেই মানুষের ভেতরে নারী-পুরুষ কেউ ছোট নয়।
- প্রেম আর অভিমান। বিদ্রোহের কবি বলে যাঁকে চেনা যায়, তিনিই আবার দোলনচাঁপার মতো বইয়ে মনের কোমল দিকটাও খুলে দিয়েছেন।
মূল বই থেকে পড়ুন
কোনো পঙ্ক্তি পছন্দ হলে তার আগে-পরের লাইনগুলোও পড়ে নিন, নজরুলের কবিতা অনেক সময় প্রসঙ্গ থেকে আলাদা করলে অর্ধেক বলে। পুরো কবিতাগুলো পাবেন অগ্নিবীণা, সঞ্চিতা আর ভাঙার গান বইয়ে।