শিক্ষা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ: শিক্ষার হেরফের থেকে শান্তিনিকেতন
প্রকাশিত:
স্কুলের চার দেয়ালে রবীন্দ্রনাথের মন বসেনি। ছোটবেলায় তিনি কলকাতার ওরিয়েন্টাল সেমিনারি, নর্ম্যাল স্কুল, বেঙ্গল অ্যাকাডেমি আর সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজিয়েট স্কুলে কিছুদিন করে পড়েছিলেন। শেষে তাঁর পড়াশোনা চলে বাড়িতে গৃহশিক্ষক রেখে। পরে তিনি নিজেই একটি স্কুল গড়েন, আর শিক্ষা নিয়ে অনেক লিখেছেন। নিচে শিক্ষা নিয়ে তাঁর মূল বাংলা লেখা থেকে কয়েকটি পঙ্ক্তি, প্রতিটির উৎসসহ।
শিক্ষার হেরফের: পড়ার সঙ্গে আনন্দ নেই
১২৯৯ বঙ্গাব্দে লেখা এই প্রবন্ধ পরে "শিক্ষা" বইয়ে (প্রকাশ ১৩১৫) জায়গা পায়। নামের "হেরফের" মানে অমিল। প্রবন্ধের শেষে তিনি এক গরিবের গল্প বলেন, যে শীতে পায় গ্রীষ্মের কাপড় আর গ্রীষ্মে শীতের কাপড়। আমাদের শিক্ষাও তেমন, জীবনের সঙ্গে মেলে না। শিশুদের শিক্ষায় আনন্দের অভাব নিয়ে তাঁর কথা:
ইহার প্রধান কারণ, বাল্যকাল হইতে আমাদের শিক্ষার সহিত আনন্দ নাই।
আরেক জায়গায় তিনি জানান, বই মুখস্থ করে জমা করা আর সেই জ্ঞান দিয়ে কিছু গড়ে তোলা এক জিনিস নয়:
সংগ্রহ এবং নির্মাণ যখন একই সঙ্গে অল্পে অল্পে অগ্রসর হইতে থাকে তখনই কাজটা পাকা রকমে হয়।
প্রবন্ধের শেষ প্রার্থনাটি আজও পড়ার মতো:
আমাদের ক্ষুধার সহিত অন্ন, শীতের সহিত বস্ত্র, ভাবের সহিত ভাষা, শিক্ষার সহিত জীবন কেবল একত্র করিয়া দাও।
শিক্ষার বাহন: মাতৃভাষায় পড়ার দাবি
১৩২২ বঙ্গাব্দের পৌষে লেখা এই প্রবন্ধে প্রশ্ন ওঠে, পড়ানো হবে কোন ভাষায়। তিনি লেখেন:
মাতৃভাষা বাংলা বলিয়াই কি বাঙালিকে দণ্ড দিতেই হইবে?
তাই বলে তিনি ইংরেজির বিরুদ্ধে ছিলেন না। একই প্রবন্ধে স্পষ্ট লিখেছেন, "বলা বাহুল্য, ইংরেজি আমাদের শেখা চাইই, শুধু পেটের জন্য নয়।" তাঁর আপত্তি ছিল সব শিক্ষাকে ইংরেজির একমাত্র পথে আটকে রাখায়। ইংরেজি আর বাংলার ধারা তাঁর ভাষায় "গঙ্গাযমুনার মতো" মিলে যাক, এটাই ছিল চাওয়া।
তোতা-কাহিনী
লিপিকা (১৯২২) বইয়ের এই ছোট রূপক গল্প রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা-ভাবনার একটি তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ। একে মুখস্থ-সর্বস্ব শিক্ষার ওপর তীব্র আক্রমণ বলা হয়। গল্পে একটি পাখিকে খাঁচায় বন্দি করে শুকনো বিদ্যা গেলানো হয়, আর সেই শিক্ষা তাকে বুদ্ধির মৃত্যুর পথে ঠেলে দেয়। ছোট্ট গল্পটি একবার পড়লে আর ভোলা যায় না।
শান্তিনিকেতন
১৯০১ সালের ডিসেম্বরে বীরভূমের শান্তিনিকেতন আশ্রমে রবীন্দ্রনাথ "ব্রহ্মচর্যাশ্রম" নামে একটি বিদ্যালয় শুরু করেন। প্রথম পাঁচজন ছাত্রের একজন ছিলেন তাঁর ছেলে রথীন্দ্রনাথ। প্রচলিত জীবিকামুখী অপূর্ণ শিক্ষার বদলে ছাত্রছাত্রীর পূর্ণ মনোবিকাশের সুযোগ দেওয়াই ছিল এর উদ্দেশ্য, আর আদর্শ এসেছিল প্রাচীন ভারতের তপোবন থেকে। ১৯১৮ সালে বিশ্বভারতীর ভিত্তি স্থাপিত হয়; ১৯৫১ সালে আইন করে এটি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা পায়। গান আর নাচকে তিনি শিক্ষার অপরিহার্য অঙ্গ মনে করতেন, তাই বিশ্বভারতীর পাঠক্রমে তা ঢুকেছিল।
আশ্রমের শিক্ষা: শিক্ষক কেমন হবেন
১৩৪৩ বঙ্গাব্দের আষাঢ়ে লেখা এই প্রবন্ধে অনেক বছরের অভিজ্ঞতার পর তিনি আশ্রমের শিক্ষার সারকথা বলেছেন।
আশ্রমের শিক্ষা পরিপূর্ণভাবে বেঁচে থাকবার শিক্ষা।
একই অনুচ্ছেদে তাঁর সেই তির্যক মন্তব্য, যা আজও পরীক্ষানির্ভর শিক্ষার ওপর খাটে:
দেখা যায় অতি ভালো কলেজি ছেলেরা পদবী অধিকার করে, বিশ্ব অধিকার করে না।
শিক্ষকের গুণের মধ্যে যেটাকে তিনি সবচেয়ে বড় আর সবচেয়ে দুর্লভ মনে করেন, তা ধৈর্য:
তাঁরাই শিক্ষক হবার উপযুক্ত যাঁরা ধৈর্যবান।
প্রবন্ধের শেষ কথাগুলো শিক্ষকের জন্য, আবার শাসকের জন্যও:
রাষ্ট্রতন্ত্রেই হোক আর শিক্ষাতন্ত্রেই হোক, কঠোর শাসননীতি শাসয়িতারই অযোগ্যতার প্রমাণ।
ইংরেজি বইয়ের ভাবনা
স্ট্রে বার্ডস (১৯১৬) বইয়ে একটি ছোট কথা আছে: মানুষ জন্মগত শিশু, তার শক্তি বেড়ে ওঠার শক্তি। কোনো উদ্ধৃতিচিহ্ন ছাড়া শুধু ভাবটুকু বললাম। শিক্ষার কথা ভাবলে এটিও মনে রাখার মতো।
ইংরেজিতে "Don't limit a child to your own learning" কথাটিও তাঁর নামে খুব ঘোরে। কিন্তু স্ট্রে বার্ডস, সাধনা, ক্রিয়েটিভ ইউনিটি আর ন্যাশনালিজম বইয়ের কোনোটিতে এর সূত্র মেলেনি, তাই এখানে এটি রাখা হয়নি।