ভালোবাসা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ: গান, কবিতা আর শেষের কবিতার পঙ্ক্তি
প্রকাশিত:
ভালোবাসা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে সুন্দর কথাগুলো পাওয়া যায় তাঁর গানে। গীতবিতানে তাঁর গান সাজানো পূজা, স্বদেশ, প্রেম, প্রকৃতির মতো পর্যায়ে, আর প্রেম পর্যায়েই আছে চেনা সব পঙ্ক্তি। এখানে সেই গানের, কবিতার আর উপন্যাসের কয়েকটি মূল বাংলা পঙ্ক্তি নিয়ে লিখছি, প্রতিটি যে বইয়ের, তার নাম দিয়ে। রবীন্দ্রনাথের নিজের ইংরেজি বইয়ের প্রেমের ভাবনাগুলো আছে লেখার শেষে।
যে ভালোবাসা সবটুকু চায় না
আমার পরান যাহা চায় তুমি তাই, তুমি তাই গো। তোমা ছাড়া আর এ জগতে মোর কেহ নাই, কিছু নাই গো॥
গীতবিতানের প্রেম পর্যায়ের ১৪২ সংখ্যক গান। এই গানের মজা হলো, এত গভীর টানের পরেও কবি ভালোবাসার মানুষকে ছেড়ে দিতে জানেন। প্রথম স্তবকেই তিনি বলেন, সে সুখ না পেলে সুখের সন্ধানে অন্য কোথাও যেতে পারে। শেষ স্তবকের কথা আরও স্পষ্ট:
তবে তুমি যাহা চাও তাই যেন পাও, আমি যত দুখ পাই গো॥
ভালোবাসার মানুষ যদি আর কারও কাছে সুখ পায়, তাতেও কবির আপত্তি নেই। এমন ভালোবাসা দাবি করে না, শুধু শুভ কামনা করে।
পথ দেখানোর ভালোবাসা
তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা, এ সমুদ্রে আর কভু হব নাকো পথহারা॥
প্রেম পর্যায়ের ১২১ সংখ্যক গান। ধ্রুবতারা এমন তারা, যে সমুদ্রের নাবিককে দিক চেনায়। যে মানুষ জীবনকে সমুদ্র ভাবে, তার কাছে প্রিয়জন সেই তারাই। গানের পরের অংশে কবি বলেন, মন কখনো বিপথে যেতে চাইলে প্রিয় মুখটি দেখে সে লজ্জায় সারা হয়।
চেনা অথচ অচেনা
আমি চিনি গো চিনি তোমারে ওগো বিদেশিনী।
গীতবিতানের প্রেম পর্যায়ের ৮৬ সংখ্যক গান। দূরদেশের এক অচেনা নারী, যে থাকে সিন্ধুপারে, অথচ কবি বলছেন তাকে তিনি শরতের সকালে দেখেছেন, মাধবীর রাতে দেখেছেন, দেখেছেন নিজের হৃদয়ের ভেতরে। ভালোবাসার একটা রূপ এই, না-দেখেও যাকে বহুদিনের চেনা মনে হয়।
প্রকৃতির এত আয়োজন কেন
যদি প্রেম দিলে না প্রাণে কেন ভোরের আকাশ ভরে দিলে এমন গানে গানে।
গীতিমাল্য বইয়ের ৪২ সংখ্যক গান। ভোরের আকাশ, তারার মালা, ফুলের শয়ন, দখিন হাওয়া, এত আয়োজন যদি ভালোবাসাই না থাকে তবে কীসের জন্য, এই প্রশ্নই গানটির প্রাণ।
ছবি থেকে বেরিয়ে আসা মানুষ
তুমি কি কেবল ছবি, শুধু পটে লিখা?
বলাকার "ছবি" কবিতার শুরু। কবি একটি ছবিকে প্রশ্ন করেন, আর সারা কবিতা জুড়ে নিজেই তার উত্তর খোঁজেন। পরে বলেন, যে মানুষ রেখার বাঁধনে স্থির হয়ে আছে বলে মনে হয়, সে আসলে বাসা বেঁধেছে জীবনের মূলে। ভুলে থাকা আর ভুলে যাওয়া যে এক জিনিস নয়, কবিতাটি সেই কথা বলে।
বিদায়ের ভালোবাসা
তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারি দান; গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়।
এই পঙ্ক্তি শেষের কবিতা উপন্যাসের শেষ অধ্যায়ের কবিতায় আছে, আবার মহুয়া কাব্যগ্রন্থে একই কবিতা "বিদায়" নামে। যে দিয়েছে সে ঋণী হয়ে থাকে যে নিয়েছে তার কাছে, কারণ নেওয়ার মধ্য দিয়েই সে দানকে অর্থ দিয়েছে। কবিতা শেষ হয় "হে বন্ধু, বিদায়" দিয়ে। বিচ্ছেদের কথা এখানে শান্ত আর কৃতজ্ঞ ভাষায় বলা।
ইংরেজি বইয়ের প্রেমের ভাবনা
রবীন্দ্রনাথ নিজে ইংরেজিতে ছোট ছোট কথা লিখেছিলেন ফায়ারফ্লাইজ (১৯২৮) আর স্ট্রে বার্ডস (১৯১৬) বইয়ে। সেখান থেকে ভালোবাসার তিনটি ভাব, কোনো উদ্ধৃতিচিহ্ন ছাড়া:
- ফায়ারফ্লাইজে তিনি লিখেছেন, ভালোবাসার দান দেওয়া যায় না, তা অপেক্ষা করে থাকে যে গ্রহণ করবে তার জন্য।
- একই বইয়ে তাঁর প্রার্থনা: আমার ভালোবাসা সূর্যের আলোর মতো তোমাকে ঘিরে থাকুক, আবার তোমাকে দিক আলোকিত স্বাধীনতা।
- স্ট্রে বার্ডসে আছে, যে ভালো করতে চায় সে দরজায় কড়া নাড়ে, আর যে ভালোবাসে সে দরজা খোলা পায়।
ইংরেজিতে "Love is an endless act of forgiveness" কথাটা রবীন্দ্রনাথের নামে খুব চলে, কিন্তু এই দুটি বইয়ে আমরা তা পাইনি। তাই সেটি এখানে নেই।