কিশোর সাহিত্য কী: ইয়াং অ্যাডাল্ট বইয়ের পরিচয় আর বাংলা উদাহরণ

কিশোর সাহিত্য কী: ইয়াং অ্যাডাল্ট বইয়ের পরিচয় আর বাংলা উদাহরণ

ইংরেজিতে "ইয়াং অ্যাডাল্ট" বা সংক্ষেপে "ওয়াই এ" বলতে বোঝায় সেই বই, যা মূলত কিশোর-কিশোরীদের কথা ভেবে লেখা। বাংলায় এর সবচেয়ে কাছের নাম কিশোর সাহিত্য। দুটো পুরোপুরি এক জিনিস নয়, তবে ভাবনাটা অনেকটা মেলে: বইয়ের কেন্দ্রে থাকে বেড়ে ওঠার বয়স, আর পাঠকও সেই বয়সের।

ইংরেজির "ইয়াং অ্যাডাল্ট" বলতে কী বোঝায়

সাধারণভাবে এ ধরনের বইয়ের পাঠক বারো থেকে আঠারো বছর বয়সী। মূল চরিত্র প্রায়ই চৌদ্দ থেকে আঠারোর মধ্যে, আর গল্প বলা হয় কিশোরের নিজের চোখে দেখা জগৎ থেকে, তার সীমিত বোঝাসুঝি নিয়েই। নিজের পরিচয় খোঁজা, বন্ধুত্ব, পরিবার, প্রথম ভালো লাগা আর ভুল করা: এই বিষয়গুলো বারবার ফিরে আসে। অনেক বইয়ের শেষ "সুখে-শান্তিতে" হয় না, কারণ বাস্তব জীবনও তেমন নয়।

শব্দটির ইতিহাসও ছোট নয়। ১৯৪৪ সালে নিউ ইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরির গ্রন্থাগারিক মার্গারেট স্কোগিন তাঁর বই-আলোচনার কলামের নাম বদলে রাখেন "তরুণদের জন্য বই"। ষাটের দশকে এই ধারা নিজের পায়ে দাঁড়ায়, আর এস. ই. হিন্টনের দ্য আউটসাইডার্স (১৯৬৭) কিশোরের জীবনের কঠিন দিক এনেছিল নস্টালজিয়া ছাড়াই, বইটি লেখার সময় লেখিকা নিজেও ছিলেন কিশোরী।

বাংলার কিশোর সাহিত্য কেমন

বাংলায় কিশোর সাহিত্য গড়ে উঠেছে অনেকটা পত্রিকার হাত ধরে। ১৯১৩ সালে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী সন্দেশ প্রকাশ শুরু করেন, আর ১৯৬১ সালে সত্যজিৎ রায় ও কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় পত্রিকাটি নতুন করে বের হয়। সন্দেশেই প্রথম দেখা দেন ফেলুদা (১৯৬৫) আর প্রোফেসর শঙ্কু (১৯৬১)। আনন্দমেলার ১৯৭১ সালের পূজাসংখ্যায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কাকাবাবু প্রথম আসেন "ভয়ংকর সুন্দর" গল্পে, সঙ্গে ভাইপো সন্তু।

গল্পের ধরনও বাংলায় নানা রকম:

  • অভিযান: বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের চাঁদের পাহাড় (১৯৩৭)। শঙ্কর নামের এক সাধারণ তরুণ রোমাঞ্চের টানে সুদূর উগান্ডা আর কালাহারির দুর্গম প্রান্তে পাড়ি দেয়।
  • গোয়েন্দা আর রহস্য: ফেলুদা, কাকাবাবু। এ ধরনের আরও বই পাবেন রহস্য কাহিনী শ্রেণিতে।
  • বিজ্ঞানের কল্পনা: শঙ্কুর দিনলিপির ঢঙে লেখা গল্পগুলো। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী শ্রেণিতেও এ জাতের লেখা আছে।
  • মজার অদ্ভুতুড়ে গল্প: শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি (১৯৭৮) ছোটদের জন্য লেখা তাঁর প্রথম উপন্যাস, কিশোর মনোজ আর তার অদ্ভুত পরিবারের গল্প।
  • ইতিহাসের সঙ্গে কিশোরের মুখোমুখি: মুহম্মদ জাফর ইকবালের আমার বন্ধু রাশেদ। একাত্তরের যুদ্ধের সময় এক মফস্বল শহরের স্কুলছাত্রদের গল্প। ২০১১ সালে এ নিয়ে চলচ্চিত্র হয়েছে।

এ ধরনের আরও বই পাবেন কিশোর সাহিত্য শ্রেণিতে।

শিশুদের বই আর বড়দের বইয়ের মাঝখানে

শিশুদের বইয়ে ছবি, ছোট বাক্য আর পরিষ্কার শিক্ষা থাকে। কিশোর সাহিত্যে গল্প আরও জটিল, চরিত্র নিজে সিদ্ধান্ত নেয়, ভুল করে, ফল ভোগ করে। আবার বড়দের উপন্যাসের মতো দীর্ঘ আত্মমগ্নতা বা জটিল সমাজচিত্রের চাপও এতে কম। ফেলুদার গল্প তাই কিশোররা যেমন পড়ে, বড়রাও তেমন পড়ে। ভালো কিশোর সাহিত্য আসলে বয়সে আটকে থাকে না।

কোন বই কার জন্য, তা বোঝার সহজ উপায়: চরিত্রের বয়স, সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা আর ভাষার সরলতা দেখুন। এই তিনটি মিললে বইটি সম্ভবত কিশোরদের জন্যই।